আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী বাংলাদেশের চিত্রকলায় সাধারণ মানুষ, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে নতুন মর্যাদায় তুলে ধরেছেন।
শেখ মোহাম্মদ সুলতান শিল্পাঙ্গনে যিনি এস এম সুলতান নামে পরিচিত ছিলেন বাবা মেছের আলী ও মা মাজু বিবির সন্তান। বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রি। অভাব-অনটনের সংসারে বেড়ে ওঠা সুলতান ছোটবেলায় বাবা-মায়ের কাছে আদর করে ‘লাল মিয়া’ নামে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই লাল মিয়াই হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী।
চিত্রশিল্পে এস এম সুলতানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলার কৃষক, জেলে, শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের জীবনসংগ্রামকে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরা। তার আঁকা মানুষের শরীরে পেশির দৃঢ়তা এবং অভিব্যক্তিতে আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠত। প্রকৃতি, মাটি ও মানুষের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্কই তার শিল্পকর্মে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে।
চিত্রকলার পাশাপাশি সংগীত ও প্রাণিজগতের প্রতিও ছিল তার বিশেষ আগ্রহ। বাঁশি বাজাতে পারতেন দক্ষতার সঙ্গে। বিভিন্ন প্রাণী পালনেও তার আগ্রহ ছিল। ফলে তার জীবনযাপনও ছিল অনেকটা প্রচলিত ধারার বাইরে, বৈচিত্র্যময় ও স্বতন্ত্র।
শিল্পক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এস এম সুলতান একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন থেকেও তিনি সম্মানিত হন। তার শিল্পকর্ম বাংলাদেশের চিত্রকলাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর অসুস্থ অবস্থায় যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন এই বরেণ্য শিল্পী। পরে নড়াইল শহরের কুড়িগ্রাম এলাকায় চিত্রা নদীর তীরে তাকে সমাহিত করা হয়।
তার স্মৃতি ধরে রাখতে নড়াইলে গড়ে উঠেছে এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা। শিল্পীর ব্যবহৃত নানা স্মারক ও তার শিল্পকর্মকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সংগ্রহশালা প্রাঙ্গণের প্রাকৃতিক পরিবেশও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। পাশাপাশি চিত্রা নদীতে থাকা সুলতানের ভ্রাম্যমাণ শিশুস্বর্গ বা দ্বিতলা নৌকাটিও দর্শনার্থীদের আগ্রহের অন্যতম কেন্দ্র।
জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নড়াইলে নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। এর মধ্যে রয়েছে কোরআন খতম, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন উৎসব, শিল্পীর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, আর্ট ক্যাম্প, শিশু-কিশোরদের চিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা সভা এবং গুণী শিল্পীকে সম্মাননা প্রদান।
এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জি জানান, শিল্পীর ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বর্ণাঢ্য আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে চিত্রশিল্পী অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তারকে ‘এস এম সুলতান সম্মাননা পদক’ দেওয়ারও আয়োজন রয়েছে।
এদিকে, এস এম সুলতানের স্মৃতি ও শিল্পকর্ম সংরক্ষণের পাশাপাশি সংগ্রহশালা এলাকার উন্নয়ন এবং পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এলাকাটিকে আরও পর্যটনবান্ধব করে তুলতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগ্রহশালার কর্মকর্তারা।
নড়াইলবাসীর কাছে এস এম সুলতান শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন; তিনি জেলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান প্রতীক। মাটি ও মানুষের জীবনকে রঙ-তুলিতে ধারণ করা এই শিল্পীর জন্মদিনে তাই নতুন করে স্মরণ করা হচ্ছে ‘লাল মিয়া’কে যিনি নিজের শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও সংগ্রামকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন।
আমাদের ইমেইল thedailyprimenewsbd@gmail.com
কপিরাইট © দ্যা ডেইলি প্রাইম নিউজ (আন্তর্জাতিক নিউজ পেপার ও মিডিয়া কোম্পানি)